Saturday , May 18 2024

ফুলের ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই

ফুলের ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে মেয়েরা যে ফুল ভালোবাসে, এই ব্যাপারটা আমার পছন্দ।

বেইলি রোডে একটা বাড়িতে পড়াই আমি। টিউশনি থেকে বেরিয়েই ১৩-১৪ বছরের এক কিশোরীর মুখোমুখি হলাম, সরু কাঠিতে অনেকগুলো বেলি ফুলের মালা ঝুলিয়ে ঘুরছে। কী অসাধারণ সুন্দরী মেয়েটা! যেমন ফুল, তেমন ফুলওয়ালী…। একমাথা ঝাঁকড়া চুল, ফেটে পড়ছে গায়ের রং, ঝরনার জলের মতো টলটলে চোখ। চোখ দেখেই বলে দেওয়া যায়, পাপ ওকে স্পর্শ করেনি এখনো। এ রকম একটা মেয়েকে বেশিক্ষণ না বলা যায় না। সে একটা মালার দাম প্রথমে চাইল ১০ টাকা। পরে বলল, ‘সব নিয়া যান। পাঁচটা আছে। ৩০ টেকা দিয়েন।’

আমি পাঁচটা বেলি ফুলের মালা হাতে বোকার মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এখন এগুলো দিয়ে কী করব? পরে আছি জিনসের প্যান্ট। পকেটগুলো বেশ চাপা। ডান পকেটে সিগারেটের প্যাকেট আর অন্য পাশে ঢাউস সেলফোন। পাঁচটা মালা সেখানে এঁটে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তা ছাড়া প্রতিটি জিনিসেরই ন্যূনতম একটা মানসম্মানবোধ থাকার কথা। বেলি ফুলকে সিগারেটের প্যাকেটের পাশে রেখে আমি অপমান করতে পারি না। আবার এদিকে ফুলের মালা হাতে নিয়ে সারা রাস্তা ঘুরে বেড়াব—এ দৃশ্য কল্পনা করতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে।

আমার যাওয়ার কথা উত্তরা, মামার বাসায়। হাতে ফুলের মালা নিয়ে সেখানে হাজির হওয়া যায় না। তা ছাড়া আমাকে শান্তিনগর থেকে বাস ধরতে হবে। পাবলিক বাসে একগুচ্ছ মালা হাতে উঠে পড়তে পারি না। সিএনজি, উবার ডাকার বিলাসিতা করাও সম্ভব নয়। মেয়েটা আমাকে বিপদেই ফেলে দিল।

আমার জীবনে কখনো কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। সব সময় ভেবেছি, বাতাসে ভেসে বেড়াব। কলকাতায় মিথিলার কোমল চোখ দুটো দেখে অন্য রকম কিছু একটা ভাবতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু সেগুনবাগিচার ওই অন্ধকার প্রেসে সেই চোখ দুটো চুরি হয়ে গেছে। সেগুলো আর আমার নয়

কেএফসির পাশে একটা বড় আকারের ডাস্টবিন হাঁ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। কেউ দেখে ফেলার আগেই হাত থেকে ফেলে দিতে হবে। হঠাৎ এক গভীর অভিমানে মনটা ভরে গেল।

২৪ বছর বয়স হয়েছে আমার। ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়ায় অনার্স শেষ করেছি। মাস্টার্সও শেষের পথে। দেখতে–শুনতে খারাপ নই। হাতে পাঁচটা বেলি ফুলের মালা। অথচ আমাকে সেগুলো কিনা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হচ্ছে!

চেনা কোনো মেয়েকে তো দিতেই পারি, আবার সম্পূর্ণ অচেনা কোনো সুন্দরী মেয়েকেও তো ফুলগুলো দেওয়া যায়। মেয়েটা রাগ করবে? কেন করবে? ফুল তো কোনো নিষিদ্ধ জিনিস নয়। ফুলগুলো দিয়ে আমি বলতে পারি, আপু, কিছু মনে করবেন না। আপনাকে দেখে মনে হলো, এই ফুলগুলো আপনাকে দেওয়া যায়। আপনিই এর যোগ্য। প্লিজ এগুলো নেন। এর পেছনে আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

ওই তো, রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ঝকঝকে চেহারার এক তরুণী। তাকে দেওয়া যায়। পা বাড়াতে গিয়েও থেমে গেলাম। শেষ পর্যন্ত সিন ক্রিয়েট হতে পারে।

মনে মনে একটা শর্ট লিস্ট তৈরি করলাম, ফুলগুলো কাকে কাকে দিতে পারি। কোনো কারণ ছাড়াই সে লিস্টে এক নম্বরে জায়গা পেয়ে গেল পারমিতাদি। অথচ পারমিতাদিকে ফুল দেব—এ রকম কথা আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।

যে মেয়েটাকে আমি বেইলি রোডে পড়াই, তার মা হলেন পারমিতা দেবী। আমাকে বেশ স্নেহ করেন। রান্নাবান্না নিয়ে বাড়িতে নানা প্রকার এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসেন। রোজ সেসব চেখে দেখতে হয় আমাকে। আজও পড়ানো শেষ করে যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন বললেন, ‘সুমন, কাস্টার্ড বানাইছি। একটু টেস্ট করে দেখবা নাকি?’

আমি কাস্টার্ড খাচ্ছিলাম। কিন্তু তাকিয়ে ছিলাম পারমিতাদির দিকে। একটু সবুজ রঙের শাড়ি পরা। ঘরে পরার সাধারণ শাড়ি নয়। কিছুক্ষণ আগে নিশ্চয়ই শাওয়ার নিয়েছেন। চুলে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছিল। দিদিকে দেখলেই মনে হয়, ওনার কোনো শৈশব নেই, কৈশোর নেই, এ রকম ভরা যৌবনেই তিনি স্বর্গ থেকে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছেন। এবং তার এই বয়সটা চিরস্থায়ী—বাড়বে না, কমবে না।

দিদিকে নিয়ে আমার মনে কোনো পাপবোধ নেই। একরাশ মুগ্ধতা আছে। এবং দিদিই সেই মানুষ, যাকে আমি ফুলগুলো উপহার দিতে পারি। তিনি খুশি হবেন এবং এই উপহারের অন্য কোনো অর্থ করার চেষ্টা করবেন না। আমি আবার টিউশনির বাড়িতে ফিরে গেলাম। কলবেল বাজাতেই বুয়া দরজা খুলে দিল। এবং জানাল, দিদি এইমাত্র অফিসার্স ক্লাবের উদ্দেশে বেরিয়ে গেছেন।

আমি কি অফিসার্স ক্লাবের দিকে যাব তাহলে? বেশি দূরে তো নয়। হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট লাগবে। ওনার ফোন নম্বর আছে। গিয়ে ফোন দিলে তিনি নিশ্চয়ই বাইরে আসবেন। তখন ফুলগুলো দিতে পারি। কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে ফুল দেওয়া এক জিনিস, আর ক্লাবে গিয়ে ভরা মজলিশে ফুল দেওয়ার অর্থ আলাদা। এমন বোকামি করা যাবে না।

লিস্টে দ্বিতীয় নাম দিপার। সে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো না। মেয়েদের যে শাড়ি–গয়নার ঘরোয়া একটা জগৎ আছে, সেই জগৎ থেকে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে সে।

দিপার সঙ্গে কথা বন্ধ আজ দুমাস হলো। সিলি একটা বিষয় নিয়ে আমরা দুজন মুখ–দেখাদেখি বন্ধ করেছি। ঘটনা খুব সামান্য। আমরা একটা ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করি। সেখানে মার্টিন স্করসিসের সিনেমা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বছর দুয়েক হলো ওনার ওয়ানস আপন আ টাইম ইন আমেরিকা ছবিটা মুক্তি পেয়েছে। সে ছবিকে আমি বলেছিলাম বাজে ছবি।

দিপা এটা মেনে নিতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল, স্করসিসের ছবি বাজে?

সব ছবির কথা বলিনি। পার্টিকুলারলি এই ছবিটা বাজে। জঘন্য।

এরপর এক–দুকথায় বিশাল ঝগড়া। অন্য কেউ হলে এই ঝগড়ার রেশ টানত না। দিপা টেনেছে। ও সরাসরি বলেছে, আমার বক্তব্য উইথড্র করতে হবে। না হলে কথা বন্ধ।

আজ এই বিকেলবেলায়, বেলি ফুলের মালা হাতে দিপার কাছে গিয়ে বলতে পারি, দিপা, আই অ্যাম সরি। সেদিন তোর সাথে অকারণে রাগারাগি করেছি। প্লিজ ভুলে যা।

ফুলগুলোর এর চেয়ে আদর্শ ব্যবহার আর কী হতে পারে? দিপার মোবাইলে কয়েকবার ফোন দিলাম। ফোন বন্ধ। পৃথিবী চায় না, দিপার সঙ্গে আমার সব ঠিকঠাক হোক। কী আর করা!

লিস্টে তৃতীয় নামটা হলো মিথিলা। অথচ এই নামটাই আসার কথা ছিল সবার আগে। আমার যদি সত্যিই কাউকে ফুল দেওয়ার মতো থাকে, সে তো মিথিলাই।

বছর দুয়েক হলো সত্যজিতের সিনেমার ওপর একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করছি। প্রতিটি সিনেমা ধরে ধরে সেই সিনেমার বিশ্লেষণ। পেছনের গল্প, সিনেমার ব্যাপারে সত্যজিতের বক্তব্য, ক্রিটিকদের বক্তব্য, তার উত্তরে সত্যজিতের জবাব। দুষ্পাপ্র্য কিছু স্টিল ফটোগ্রাফও আছে। সেই পাণ্ডুলিপি অনুমোদনের জন্য সন্দীপ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে হয়েছিল। দেখা না করলেও চলত। তবে প্রকাশক বলল, ওনার ছেলে যেহেতু জীবিত আছে, তাকে একবার দেখিয়ে নিলে ভালো হয়। বলাই বাহুল্য, প্রকাশক হলো মিথিলা। আমার সমান বয়স। কিন্তু জীবনীশক্তিতে আমাকে অনায়াসে ৩-০ গোলে হারিয়ে দিতে পারবে।

প্রথমে ওই পক্ষের সঙ্গে মেইল চালাচালি। একটু একটু করে কাজ এগোচ্ছিল। গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে গেলাম। তারপর সন্দীপ রায় বললেন মুখোমুখি একবার দেখা করতে। তাঁদের বাড়িতে সত্যজিতের দুষ্পাপ্র্য কিছু ছবি আছে। তাঁর ব্যবহৃত জিনিসগুলোর স্টিল ফটোগ্রাফও আমরা নিতে পারি। সেগুলো বইটাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

কলকাতা কেন, নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার টাকাও আমার পকেটে থাকে না। পাসপোর্ট, ভিসা—এসবের নাম শুনলেও জ্বর আসে। সেবার মূলত মিথিলার গরজেই কলকাতায় গিয়েছিলাম। পার্ক স্ট্রিটের একটা হোটেলে সপ্তাহখানেক ছিলাম।

সে ছিল বড় মধুর সময়। দুটো মানুষ একটু একটু করে কাছে আসছে, এর চেয়ে দারুণ ব্যাপার আর কী হতে পারে? শেষের দুটো দিন আমরা আর হোটেলে আলাদা দুটো রুমে থাকিনি। এক ঘরে ছিলাম।

মহিলা সমিতির সামনে দাঁড়িয়ে আমি ফোন করলাম মিথিলাকে। ওপাশ থেকে আদুরে গলা ভেসে এল, হ্যালো।

বললাম, আমি একটু আসতে চাচ্ছি।

কিন্তু আজ তো আমার একটু কাজ আছে।

দেখা করেই চলে যাব। এক মিনিটও লাগবে না।

আমি প্রেসে। নতুন একটা বই আসতেছে এ মাসে। কাজ চলতেছে।

তুমি তোমার কাজ করবা। আমি বিরক্ত করব না। একটা জিনিস আছে তোমার জন্য। এসে দিয়ে যাব।

কী জিনিস?

সেটা তো আসলেই দেখতে পারবা।

আচ্ছা আসো। অফিসেই আসো। আধা ঘণ্টা পর। প্রেসে আসতে হবে না।

কথা শেষ করে রিকশা নিলাম। মিথিলার অফিস সেগুনবাগিচায়। বিকেলের দিকে কাকরাইলে ভয়াবহ জ্যাম পড়ে। ৩০ মিনিটে সেখানে পৌঁছানো কষ্ট। ভাগ্য ভালো, আজ রাস্তা ফাঁকা।

শিল্পকলা একাডেমির পাশের গলিতে চিটাগং হোটেল। তার উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ে দোতলায় মিথিলার এক রুমের সাবলেট অফিস। সেখানে আরও একটা বড় প্রকাশনা সংস্থার অফিস আছে। নিচতলায় ওই বড় প্রকাশনা সংস্থার নিজস্ব প্রেস। মিথিলা সেই প্রেস থেকেই তার বইগুলো ছাপায়।

মিথিলা বলেছিল, আধা ঘণ্টা পর যেতে। আমি চলে এসেছি ১৮ মিনিট আগে। ভাবলাম, তার প্রেসের কাজ শেষ হয়নি। এখনো বোধ হয় ভেতরে। অফিসে না গিয়ে নিচতলায় প্রেসের দরজায় মৃদু ধাক্কা দিলাম। দরজাটা খোলা।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম, অন্ধকার। দূরে একচিলতে আলো। রোমান পোলনস্কির ছবির একটা দৃশ্য যেন। দূর থেকে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ আসছে।

একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে গেলাম। সামনের জায়গাটায় মৃদু আলো। সেখানে দুটো চেয়ার পাতা। মিথিলা আর তার উল্টো দিকে চেয়ারে একটা ছেলে বসা। পেছন থেকে চেহারাটা দেখতে পাচ্ছিলাম না ছেলেটার। তবে চুলগুলো এলোমেলো। মৃদু স্বরে কিছু একটা বলছে। এখান থেকে শুনতে পাওয়া যায় না। মিথিলা একমনে সেই কথাগুলো শুনছে। চট করে অন্ধকারে সরে গেলাম।

দৃশ্যটার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। একেবারে ঠিকঠাক। নিষ্পাপ একটা ছবি। এমন নয় যে ওরা দুজন অন্তরঙ্গ হয়ে বসে ছিল। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ওভাবে বসে থাকতেই পারে। আমি যেখানে দাঁড়ানো, সেখান থেকে মিথিলার চোখ দুটো ভালো করে দেখা যায়। হলুদ একটা আলো এসে পড়েছে তার চোখে। সে দুটো চোখ ভারি কোমল। মেয়েদের চোখ এ রকম কোমল কখন হয়, ঠিক জানি আমি। ভুল হয়নি, এ চোখের ভাষা আমি বুঝি।

কিছু না বলে ধীরে ধীরে পিছিয়ে এলাম। বেরিয়ে এলাম প্রেস ছেড়ে। শিল্পকলার পাশে চায়ের দোকানে চা অর্ডার করে সিগারেট ধরালাম। ভাবছিলাম কী করব…।

জীবনের নিকৃষ্টতম চা খেয়েছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক রেলস্টেশনে। বমি এসে গিয়েছিল চায়ে চুমুক দিয়ে। কিন্তু আজকের চা-টা মনে হলো সেটাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

আমার জীবনে কখনো কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। সব সময় ভেবেছি, বাতাসে ভেসে বেড়াব। কলকাতায় মিথিলার কোমল চোখ দুটো দেখে অন্য রকম কিছু একটা ভাবতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু সেগুনবাগিচার ওই অন্ধকার প্রেসে সেই চোখ দুটো চুরি হয়ে গেছে। সেগুলো আর আমার নয়। অন্য কারও।

আমার হাতে পাঁচটা বেলি ফুলের মালা। কোনো এক অজানা গন্তব্যে এগুলো পৌঁছাবে। দীর্ঘ পথ হাঁটতে হবে গন্তব্য খুঁজে পেতে।

About admin

Check Also

অপয়া

আমি যখন জন্মেছিলাম , তখন না কি সবার মুখ অন্ধকার । ”ইশ ,শেষে কি না …